সকালে ঘুম ভাঙার পর বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি দুই পাশে পাহাড়, চা-বাগান, বিশাল বিশাল গাছ আর সাথে মৃদু বাতাস। একটা সবুজ সকাল! এমন সকাল দেখা সৌভাগ্য বটে! শ্রীমঙ্গল প্রথমেই যে দৃশ্যটি আমায় দেখালো, তা এককথায় মনোমুগ্ধকর! চলুন শুরু থেকে বলি।
বলছি গত বছরের জুনের কথা। সেমিস্টার ফাইনাল শেষে লম্বা এক ছুটি। কী করি, কোথায় যাই ভাবতে ভাবতে তিন রুমমেট মিলে ঠিক করলাম প্রকৃতির কাছে যাবো—যেখানে থাকবে সবুজের সমারোহ, সাথে প্রাণের স্পন্দন। 'পরিব্রাজক' নামের একটা ট্যুর গ্রুপের সাথে রওনা দিয়ে দিলাম শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে। রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে সকালে শ্রীমঙ্গল পৌঁছেছি। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছি প্রায় মধ্যরাতে।
বাসভ্রমণ আমার কিছুটা অপ্রিয়। কিন্তু শ্রীমঙ্গল যাওয়ার বাসভ্রমণ আজীবন মনে রাখবো; কারণ ঝুম বৃষ্টি। গভীর রাতে বাস হাইওয়ে দিয়ে সাঁইসাঁই করে চলছিলো, তখন শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। বাতাস নেই, ঝড় নেই, শুধু আকাশ থেকে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা হাইওয়েতে পড়ছে। কী যে প্রশান্তি, লেখায় ফুটিয়ে তোলার মতো না!
সুন্দর রাত পেরিয়ে ভোর হলো। আমরাও শ্রীমঙ্গলে। জীবনে প্রথমবার চা-বাগান দেখা! পাহাড়, বাগান আর গাছগাছালি—সবুজে সবুজে সয়লাব। ঢাকায় সকাল কাটে অ্যালার্মের শব্দে; এ সকাল ভিন্ন, সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রীমঙ্গল শহরে নাস্তা সেরে বিখ্যাত 'চান্দের গাড়ি'তে চড়লাম সবাই। সবাই মিলে গান গাইতে গাইতে চলে গেলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। এই উদ্যানে শুট হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা "আমার আছে জল"। শুট হয়েছে পরিচালক মাইকেল টডের অস্কারজয়ী সিনেমা “অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টি ডেজ”। পথে সবার একসাথে গাওয়া গানগুলোর মধ্যে একটা এখনো কানে বাজছে—কৃষ্ণপক্ষ ব্যান্ডের "চলে আমার চান্দের গাড়ি, যাইবো সোনা বন্ধুর বাড়ি"।
লাউয়াছড়ায় পৌঁছে প্রকৃতির লীলা দেখলাম। ঘন বন, নানান জাতের অসংখ্য গাছপালা আর পাখির কলরব। এখানে বানর আছে, আছে সাপ ও শুয়োর। কী ভীষণ সুন্দর!
হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই লাউয়াছড়ার ভেতরে এক খাসিয়া পল্লীতে। এই প্রথম বাঙালি সমাজের বাইরে নতুন এক সমাজ দেখলাম। খাসিয়াদের সাথে বসে চা খেলাম, গল্প করলাম। তারা যথেষ্ট আন্তরিক, তবে কিছুটা অন্তর্মুখী। আমাদের মতো পর্যটক অনেক আসে, গল্প করে, প্রশ্ন করে—তারা এগুলোতে অভ্যস্ত, বোঝাই যায়। নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকতেই হয় তাদের।
লাউয়াছড়া থেকে মাধবপুর লেক। চা-বাগান, টিলা, আর মাঝে লেক। লেকে বাহারি শাপলা ফুল। ইচ্ছে হচ্ছিলো চা-বাগানের উপর দিয়ে শঙ্খচিলের মতো উড়ে বেড়াই, দৌড়ে দৌড়ে গান গাই আর লেকের জলে স্নান করি। বাগানে কয়েকজন চা-শ্রমিক আর স্থানীয় দোকানদারের সাথে কথা হলো। চা-শ্রমিকরা প্রায় সবাই নারী। আমাদের ছবি তুলতে দেখে এগিয়ে এসে ছবি তুলতে চাইলো। রোদ থেকে বাঁচার মাথালটা আমাদের এগিয়ে দিলো; বললো মাথায় দিয়ে ছবি তুলতে। পরিশ্রমী হাসিমাখা মুখগুলো রোদের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পাশে কয়েকজন বসে ভাত খাচ্ছে কচি চা-পাতার ভর্তা আর নুন মেখে। তাদের দেখে কেন যেন মনে হলো, জীবন নিয়ে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, অভিযোগ নেই—কিন্তু চোখজুড়ে আছে স্বপ্ন।
কয়েকজন ফটোগ্রাফার দেখা গেলো, অর্থের বিনিময়ে ডিএসএলআর ক্যামেরায় ছবি তুলে দিচ্ছে। একজন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে কথা হলো, সাথে তাঁর নাতি। দুজন মিলে ওয়াশরুম দেখাশোনা করেন। একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করে চা-বাগানের পাশে কোনো এক এলাকায় এসেছিলেন, আর ফেরা হয়নি বাবার বাড়ি। স্বামী-সন্তান-পরিবার নিয়ে সুখে আছেন।
এবার ফেরার পালা! বিকেলে শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাসে বাজছে 'হাওয়া' মুভির গান—"এ হাওয়া আমায় নেবে কতদূরে!" শ্রীমঙ্গলের হাওয়া আমায় বদলে দিয়েছিলো, দিয়েছিল প্রশান্তি। জুনের শুরুতে যখন ভীষণ খারাপ সময় কাটাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই শ্রীমঙ্গল আমায় ডেকেছিলো আর প্রাণভরে তার স্নিগ্ধতা দান করেছিলো। বাসে বসে আমি ভাবছিলাম, নিরাশার দিনগুলো কত দীর্ঘ আর প্রাণবন্ত দিনগুলো কত ক্ষুদ্র! দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ থেকে ফিরতে মন খারাপ হচ্ছিলো। ঢাকায় ফিরেও মনটা উশখুশ করছিলো। অবশ্য যতবার মোবাইলে তোলা ছবি আর ভিডিও দেখি, ততবার যেন নতুন করে শ্রীমঙ্গল ঘুরে ফেলি।